প্রতিষ্ঠার পঞ্চাশ বছর : ওআইসির পথচলা

0
238

অরগানাইজেশান অব ইসলামিক কো-অপারেশন (Organization of the Islamic Cooperation)। সংক্ষেপে ওআইসি (OIC)। মুসলিম রাষ্ট্র ও জনগণের সার্বিক কল্যাণ, উন্নতি ও সংহতির লক্ষ্যে গঠিত আন্তর্জাতিক সংস্থা। বিশ্বের ৫৭টি মুসলিম রাষ্ট্র বর্তমানে এর সদস্য। ওআইসির প্রধান কার্যালয় সৌদি আরবের জেদ্দায়। সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পার করেছে গেল অাগস্টে। তাদের ৫০ বছরের পথচলার সফলতা-ব্যর্থতা নিয়েই আজকের আলাপ।

প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট ও প্রতিষ্ঠা

১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে ৬ দিনের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে ইহুদিদের নানা কূটকৌশল ও ষড়যন্ত্রে আরব বাহিনী যখন পরাজিত হলো, তার দুবছর পর ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ২১ আগস্ট ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমি জেরুসালেমে মসজিদুল আকসায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটায়। এতে পুরো মুসলিম বিশ্ব ব্যথিত এবং হতবাক হয়। একই সঙ্গে প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন মুসলিম বিশ্বের জনগণ। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২৫ আগস্ট মিশরের রাজধানী কায়রোতে ১৪টি আরব দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীগণ একটি বৈঠকে মিলিত হন। এ বৈঠকেই সিদ্ধান্ত হয়, ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমিতে ইসরায়েলি হানাদারদের কালো থাবা রুখতে এবং ফিলিস্তিনি জনগণকে যথাযথ সাহায্য-সহযোগিতা ও সমর্থন প্রদান করতে মুসলিম দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ একটি প্লাটফর্ম থেকে কাজ করতে হবে।

এই মিটিংয়ের পরের মাসে সেপ্টেম্বরের ২২ থেকে ২৫ তারিখ চারদিন ব্যাপী একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় মরক্কোর রাবাতে। এতে ২৫টি মুসলমি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান অংশগ্রহণ করেন। এবং সকলের আগ্রহ ও স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতির ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে অরগানাইজেশান অব ইসলামি কনফারেন্স নামে সংগঠনটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।

পথচলা

১৯৬৯ সালে রাবাতের সম্মেলনের পর প্রতি তিন-চার বছর অন্তর অন্তর সংস্থাটির উদ্যোগে এরকম আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে সদস্য দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানরা উপস্থিত থাকার চেষ্টা করেন। রাষ্ট্রপ্রধান উপস্থিত না থাকলে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে মন্ত্রী পর্যায়ের একজন উপস্থিত থাকেন।

প্রতিষ্ঠার পর সংস্থাটির সদর দপ্তর রাখা হয় সৌদি আরবের জেদ্দা শহরে। তবে ওআইসি সম্মেলন একেক বছর একেক দেশে অনুষ্ঠিত হয়। ৫০ বছরে এ পর্যন্ত মোট ১৪টি সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। চলতি বছরের জুন মাসে সর্বশেষ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয় সৌদি আরবে।

বর্তমানে ওআইসির সদস্য রাষ্ট্রের সংখ্যা মোট ৫৭টি। প্রত্যেকটি রাষ্ট্রই মুসলিম দেশ। বিশ্বের সবকটি মুসলিম দেশই ইতিমধ্যে ওআইসির সদস্যপদ লাভ করেছে।

২০১১ খ্রিষ্টাব্দে সংগঠনটির নাম ‘অরগানাইজেশান অব ইসলামি কনফারেন্স’ থেকে পরিবর্তন করে ‘অরগানাইজেশান অব ইসলামিক কো-অপারেশন (Organization of the Islamic Cooperation)’ রাখা হয়। ২০১১-এর ২৮ জুন কাজাখস্তানের আস্তানায় অনুষ্ঠিত ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক বিশেষ বৈঠকে এ পরিবর্তন আনা হয়।

লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

মোট সাতটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে ওআইসি’র পথচলা শুরু হয়েছিল।
১. সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে ইসলামী সংহতি বৃদ্ধি করা।
২. সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রসমূহে সদস্যরাষ্ট্রসমূহের মধ্যে সহযোগিতা সংহত করা এবং আন্তর্জাতিক ফোরামসমূহে নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করা।
৩. বর্ণ বৈষম্যের মূলোচ্ছেদ এবং উপনিবেশবাদ বিলোপের চেষ্টা অব্যাহত রাখা।
৪. আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতি প্রয়োজনীয় সমর্থন প্রদান করা।
৫. পবিত্র স্থান সমূহের নিরাপত্তা বিধানের সংগ্রামকে সমন্বিত এবং সুসংহত করা এবং ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য সংগ্রামকে সমর্থন করা এবং তাদের অধিকার আদায় এবং স্বদেশ রক্ষা করার কাজে সাহায্য প্রদান।
৬. মুসলমানদের মান মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং জাতীয় অধিকার সংরক্ষণের সকল সংগ্রামে মুসলিম জনগণকে শক্তি যোগানো।
৭. সদস্য রাষ্ট্রসমূহ এবং অন্যান্য দেশের মধ্যে সহযোগিতা এবং সমঝোতা বৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা।

লক্ষ্য পূরণে কতটা সফল 

যে সাতটি লক্ষ্য নিয়ে সৌদি আরবের বাদশাহ ফয়সলের ঐকান্তিক চেষ্টা ও পরিশ্রমে গড়ে উঠেছিল ওআইসি, মুসলিম-বিদ্বেষী শক্তির অব্যাহত কূটচালের কারণে তার কোনোটাই সফলতার মুখ দেখেনি। কথা ছিল ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের নানা ভূখণ্ডে ছড়িয়ে থাকা পবিত্র স্থানগুলোর হেফাজতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। আল-আকসা ভূমি পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে ওআইসির তরফ থেকে, কিন্তু ৫০ বছরের দীর্ঘ যাত্রায় সংস্থাটি নূন্যতম কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি। গত পঞ্চাশ বছরে ফিলিস্তিনের অবস্থা আরও সংকটপূর্ণ হয়েছে দিনকে দিন। ফিলিস্তিনের বিশাল ভূখণ্ডের পঁচানব্বই ভাগেরও বেশি জায়গা এখন ইসরাইলের দখলে।

সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে তথা মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য বিনির্মাণ এবং বিশ্বের মুসলিমদের সার্বিক কল্যাণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কাজ করার কথা ছিল এই সংগঠনের। কিন্তু বিগত ৫০ বছরে বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোতে কেবল অনৈক্যই বেড়েছে, ঐক্যে আসেনি কেউ। একই সঙ্গে এই ৫০ বছরে বিশ্বের নানা প্রান্তে মুসলিমরা যতটা নিগ্রহ ও নির্মমতার শিকার হয়েছে, ইতিহাসে এর নজির মেলা ভার।

মুসলিম দেশগুলো আজ যুদ্ধ, সংঘাত, হানাহানি এবং মারামারিতে বিপর্যস্ত। মুসলিম বিশ্বের সর্বত্রই হতাশা, দুর্দশা। সৌদি আরব এবং ইরান মুসলিম বিশ্বের দুটি প্রভাবশালী দেশ। অথচ দেশ দুটির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বৈরিতা চলছে এবং বর্তমানে দেশ দুটির মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কও বিচ্ছিন্ন। আর এই বৈরিতার কারণে মুসলিম বিশ্ব বছরের পর বছর ধরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ দ্বন্দ্বের কারণে ওআইসি কখনো গঠনমূলক কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি।

মুসলিম দেশগুলোর অনৈক্যের পরিণতি কী তা কয়েকটি উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হবে। ফিলিস্তিনের কথা তো বলাই হলো। কয়েক লাখ ফিলিস্তিনি বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন দেশের শরণার্থী শিবিরে জীবনযাপন করছেন। অনেক ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরেই জন্মগ্রহণ করেছেন, শরণার্থী শিবিরেই বড় হয়েছেন এবং শরণার্থী শিবিরেই মৃত্যুবরণ করেছেন। এখানকার রাজনীতিও সৌদি-ইরান দুই মেরুতে বিভক্ত। হামাসকে সমর্থন দিচ্ছে ইরান আর পিএলওকে সমর্থন দিচ্ছে সৌদি আরব। ফলে ফিলিস্তিনিরা ইসরাইলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে পারছে না।

আফগানিস্তানে আমেরিকার অংশগ্রহণ ও মদদে ১৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চলছে। মুসলিম দেশগুলোর কিংবা ওআইসির কার্যকর কোনো ভূমিকা থাকলে এখানে দীর্ঘকালের এ যুদ্ধ চলত না।

২৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে সোমালিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধে সোমালিয়া আজ ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলছে। প্রেসিডেন্ট আসাদের পক্ষে আছে ইরান, আর আসাদবিরোধী পক্ষকে সমর্থন করছে সৌদি আরব। যুদ্ধে যুদ্ধে সিরিয়া আজ শেষ। ইতোমধ্যে তিন লাখ সিরিয়ান মারা গেছেন, আর চল্লিশ লাখ সিরিয়ান উদ্বাস্তু হয়েছেন।

ইয়েমেনেও আজ গৃহযুদ্ধ চলছে। সেখানেও একপক্ষে আছে সৌদি আরব আর একপক্ষে আছে ইরান। গৃহযুদ্ধে ইতোমধ্যে ইয়েমেনও ধ্বংস হয়েছে এবং ৬০ হাজার ইয়েমেনি মারা গেছে।

মিসরের বর্তমান শাসক সিসিকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিচ্ছে সৌদি আরব। ব্রাদারহুডকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সৌদি আরব ব্যাপক তৎপরতা চালায়। আর মুসলিম ও ইসলামি আদর্শে বিশ্বাসী ব্রাদারহুডের পক্ষে যেন কেউ নেই।

মুসলিম দেশগুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্বে মুসলিম দেশগুলো যখন বহুদাবিভক্ত, তখন সাম্রাজ্যবাদীরা কৌশলে মুসলিম দেশগুলোকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া ও ইয়েমেন তার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ। যুদ্ধে যুদ্ধে লিবিয়াও আজ শেষ। মিয়ানমারের শাসকরা আরাকানের মুসলমানদের ওপর বছরের পর বছর ধরে নির্যাতন চালাচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তাদের সাহায্য করার সময় এবং শক্তি আজ মুসলিম দেশগুলোর নেই। কারণ তারা নিজেরা নিজেরাই ঝগড়া-বিবাদে ব্যস্ত।

ওআইসি যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার সিকিভাগও যদি কার্যকর থাকত, তাহলে মুসলিম বিশ্বকে আজ এই করুণ পরিণতির মুখোমুখি দাঁড়াতে হতো না।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here