প্রাকৃতিক আবিষ্কার সংক্রান্ত মুজিজাসমূহ-১

0
378

কুরআন মাজিদ একটি উলেখযোগ্য− সংখ্যক প্রাকৃতিক বিস্ময়ের বর্ণনা দেয়, যা তার অবতরণকালে মানুষের কাছে অজানা ছিল । তবে কুরআন মাজিদ এসব ঘটনাবলির এমন ভাষায় বর্ণনা দেয় যা স্থান-কাল-পাত্র বেধে সবার কাছে বোধগম্য। যদি কুরআন মাজিদ এসব বিষয় বর্ণনার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট পরিভাষা ব্যবহার করত, যেমন : গ্রহসমূহের কক্ষপথে বৃত্তাকার পরিভ্রমণ, অসংখ্য গ্যালাক্সি বা ছায়াপথের উপস্থিতি, মহাবিশ্বের নিত্য সম্প্রসারণ ইত্যাদি- তাহলে কয়েক শতাব্দী পূর্বের মানুষেরাও তা পরিপূর্ণভাবে অনুধাবন করতে সক্ষম হত না। এমনকি এটি কুরআন মাজিদের অন্য একটি মুজিজা যে, এতে পূর্বের অজানা অনেক প্রাকৃতিক ঘটনা ও তথ্য এমন ভাষায় সন্নিবেশিত হয়েছে যা একটি সার্বজনীন বার্তা বহন করে।

এটি অতীত প্রজন্মের মানুষের মধ্যে কোনো দ্বিধার উদ্রেক করে নি। পাশাপাশি এটি প্রত্যেক যুগের মানুষের জন্যে বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জের একটি চলমান উৎসে পরিণত হয়েছে। নিরন্তর গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের ফলে মানুষের জ্ঞান ভাণ্ডারে চৌদ্দশ বছরের ক্রমাগত সমৃদ্ধি দেখিয়ে দিয়েছে যে, প্রকৃতির রহস্য সম্পর্কে কুরআন মাজিদ যা-ই বর্ণনা দিয়েছে তা চিরসত্য। প্রকতিৃ সম্পর্কে সাম্প্রতিক আবিষ্কারসমূহ মানুষকে কুরআন মাজিদের বার্তাসমূহ নতুন আগ্রহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে উপলব্ধি করতে সক্ষম করেছে।

কুরআন মাজিদের বাণীসমূহ এমন যে, তা প্রত্যেক নতুন প্রজন্মের সঙ্গে জ্ঞান ও বোধশক্তির মান অনুযায়ী সরাসরি কথা বলে। এই আবিষ্কারসমূহ সব ধরনের সহজলভ্য বৈজ্ঞানিক ডাটা ব্যবহার করে মানুষকে কুরআন মাজিদের আয়াতসমূহ অনুধাবন ও হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম করেছে। এটি কুরআন মাজিদের অন্য একটি মুজিজা যে, এ সকল প্রাকৃতিক আবিষ্কারের কোনোটিই কুরআন মাজিদের একটি সাধারণ আয়াত, এমনকি একটি শব্দের মধ্যেও, কোনো অসঙ্গতি খুঁজে পায় না। পক্ষান্তরে এই আবিষ্কারসমূহ কুরআন মাজিদের বিষয়বস্তুর সত্যতার সপক্ষে সাক্ষ্য বহন করে।

কুরআন মাজিদের বৈজ্ঞানিক তথ্য, যা আগত পৃষ্ঠাগুলিতে উপস্থাপিত হয়েছে- তার অধিকাংশই মানুষ বিগত দুই শতাব্দীর মধ্যে আবিষ্কার করেছে। অথচ এই তথ্যগুলি মানুষের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে চৌদ্দশ বছরেরও অধিককাল পূর্বে এমন এক নবীর মাধ্যমে যিনি নিরক্ষর, যিনি না জানতেন পড়তে, না জানতেন লিখতে। এমনকি জানতেন না নিজের নামটি পর্যন্ত স্বাক্ষর করতে। নিশ্চিতভাবে বলা যায় এই বিষয়সমূহ এই নিরক্ষর বা উম্মি নবী সা-এর কল্পনা কিংবা রচনা হতে পারে না। এ কথা বিশ্বাস করা ব্যতীত গত্যন্তর নেই যে, কুরআন মাজিদ সেই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ আসমানি গ্রন্থ যিনি মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা। তা কোনোভাবেই চৌদ্দশ বছরের অধিককাল পূর্বের একজন ব্যক্তির রচনা হতে পারে না। নিম্নে কুরআন মাজিদের মুজিজাধর্মী বিস্ময়কর কিছু আয়াত তুলে ধরা হল :

মুজিজা-১৩

একটি গ্যাসীয় পিণ্ডরূপে মহাবিশ্বের সূচনা

তিনি মনোনিবেশ করলেন আসমানের (সৃষ্টির) প্রতি, যখন তা ছিল (কেবল) একটি ধুম্রকুঞ্জ। (ফুসসিলাত, ৪১ : ১১)

এই আয়াত নির্দেশ করে, গ্রহ-নক্ষত্র সমেত বিভিন্ন ছায়াপথ গঠিত হওয়ার পূর্বে, সূচনালগ্নে মহাকাশ ছিল কেবল একটি ধুম্রকুঞ্জ। Big Bang (মহা বিস্ফোরণ) তত্ত্বের একটি পরিমার্জিত রূপ, যার নাম Inflationary theory (স্ফীতি তত্ত্ব)। এটি একটি শূন্যস্থান থেকে আদি ঘনীভূত বস্তুর উদ্ভব হওয়ার বর্ণনা দেয়। বর্তমানে জ্যোতির্বিদদের কাছে অন্যান্য ছায়াপথগুলি মহাজাগতিক স্বর্পিল বাষ্পকুণ্ডলী ঘনীভূত হওয়ার মাধ্যমে গঠিত হওয়ার ছবি রয়েছে। সাম্প্রতিককালের এই দুই আবিষ্কার কুরআন মাজিদের উপরোক্ত আয়াতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যা হোক, এখানে লক্ষণীয় বিষয় হল, জ্যোতির্বিদরা যাকে Mist বা ‘বাষ্প’ বলেছে, কুরআন মাজিদ তাকে বলেছে Smoke বা ‘ধুম্র’। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ‘বাষ্প’ হল পানির একটি শীতল ও শান্ত উড়ন্ত ধারা বা স্প্রে। পক্ষান্তরে ধুম্র হল একটি উষ্ণ বায়বীয় পিণ্ড যা কিছু উড়ন্ত অনুকণা ধারণ করে। মূলত: এটিও কুরআন মাজিদের একটি সাহিত্যগত মু’জিজার দৃষ্টান্ত যে, এটি আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে যথোপযুক্ত শব্দ ব্যবহার করে তার যথার্থ বর্ণনা পেশ করে।

মুজিজা-১৪

একক বস্তুরূপে মহাবিশ্বের উদ্ভব

কাফেররা কি দেখে না যে, আকাশ ও পৃথিবী ছিল একত্রে সংলগ্ন (একটি টুকরার মত), অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করলাম। (আম্বিয়া, ২১ : ৩০)

এই আয়াতে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলা এমন একটি রহস্যের বর্ণনা দিয়েছেন যা বহু শতাব্দী পর্যন্ত বড় বড় প্রকতিৃ বিজ্ঞানী ও মহাকাশ বিজ্ঞানীদের অগোচরে ছিল। কুরআন মাজিদ এই আয়াতে মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্যকে ব্যক্ত করেছে দু’টি বিশেষ শব্দ ব্যবহার করে : ‘ফাতাক্ব’ ও ‘রাতাক্ব’। আরবি ভাষায় ‘রাতাক্ব’ শব্দের অর্থ হল বস্তুর বিভাজন ও ভাঙনের প্রক্রিয়া এবং ‘রাতাক্ব’ শব্দের অর্থ হল, একটি সমজাতীয় ক্ষেত্রে কিছু পদার্থকে একত্রিতভাবে বাঁধা ও গ্রথিত করা। যাহোক, আয়াতে বলা হয়েছে, মহাকাশ ও পৃথিবী প্রথমে একত্রে সংলগ্ন ছিল এবং পরবর্তীতে সেগুলি পৃথক হয়ে যায়।

মহাকাশ বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা, বিশেষত মহাবিশ্ব সৃষ্টি সম্পর্কিত Big Bang তত্ত্ব কুরআন মাজিদের এই বর্ণনাকে সমর্থন করে। Big Bang তত্ত্বটি সর্বপ্রথম ১৯৫০ সালে রাল্প আলফার, হ্যান্স বিথ ও জর্জ গ্যাস্মো কর্তৃক প্রস্তাবিত হয়। এই তত্ত্বানুসারে, গোড়াতে এই মহাবিশ্ব বস্তু ও শক্তির একটি অতি ঘন পিণ্ডের আকতিতেৃ একক ইউনিটরূপে কেন্দ্রীভূত ছিল। প্রায় পনের বিলিয়ন বছর পূর্বে একটি বিস্ফোরণ সংগঠিত হয়। যখন কেবল ১০-৩২ সেকেন্ডের মধ্যে মহাবিশ্ব তার পূর্ব আয়তনের ১০ থেকে ৩০ কিংবা তারও অধিক গুণ বেশি প্রসারিত হয়। এই আকস্মিক মহা-বিস্ফোরণের ফলে বস্তু ও শক্তির অতি ঘন পিণ্ডটি টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে, যা ভিন্ন ভিন্ন গতিতে ও ভিন্ন ভিন্ন দিকে ঘুরতে থাকে। অবশেষে বর্তমান মহাকাশের (মহাবিশ্বের) রূপ পরিগ্রহ করে। কুরআন মাজিদের এই আয়াতটি এ কথারই বর্ণনা দেয়- ‘আকাশ ও পৃথিবী ছিল একত্রে সংলগ্ন, অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করলাম।’

মুজিজা-১৫

আদি পিণ্ড বিভাজন ও বিক্ষেপনে সময় উপাদান

নিশ্চয় আমি (আল্লাহ) প্রত্যেক বস্তু সৃষ্টি করেছি পরিমিতরূপে, আমার কাজ তো এক মুহূর্তে, চোখের পলকের মত। (ক্বাসাস, ২৮ : ৪৯-৫০)

উপরোক্ত আয়াতের বর্ণনার অনুরূপ, বিজ্ঞানীরা মনে করে, আদি পিণ্ড বিভাজন ও বিক্ষেপনে সময় লেগেছিল ১/১০-৩২ সেকেন্ডেরও কম। এই আয়াত বলে আল্লাহ তাআলার আদেশ, চোখের পলকের মত। অন্যকথায় বলা যায়, আমাদের বর্তমান মহাবিশ্ব গঠনে সময় লেগেছিল শূন্য সেকেন্ডের একটি ক্ষুদ্রতম ভগ্নাংশ। ১৯৭৭ সালে বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়েছিল এই আবিষ্কারের জন্যে। অথচ কুরআন মাজিদ রহস্যের জট উম্মোচন করেছে বহু শতাব্দী পূর্বে।

মুজিজা-১৬

একাধিক বিশ্বের উপস্থিতি

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্যে, যিনি সকল বিশ্বের প্রতিপালক। (ফাতিহা, ০১ : ০১)

এটি কুরআন মাজিদের প্রথম সুরার প্রথম আয়াত। চৌদ্দশত বছর পূর্বে মানুষের মন, পৃথিবী, সৌর জগৎ কিংবা ছায়াপথসমূহ সম্পর্কে কোনো ধরনের স্বচ্ছ ধারণা করতে অক্ষম ছিল। এমতাবস্থায় কুরআন মাজিদের সর্বপ্রথম আয়াত বলে যে, আল্লাহ তাআলা সকল বিশ্বের অধিপতি, যা পৃথিবী ব্যতীত আরও একাধিক বিশ্বের উপস্থিতির সাক্ষ্য বহন করে। বস্তুত ‘সকল বিশ্বের অধিপতি’ কথাটি কুরআন মাজিদে সর্বমোট ৭৩ বার দেখা যায়। যেমন : সুরা ও আয়াত নং ২: ১৩১; ৬: ৪৫,৭১; ২৬: ১৬; ৩২: ০২; ৪১:০৯; ৪৩: ৪৬; ৬৯: ৪৩ ইত্যাদি। বর্তমানে মানব সমাজ এ ব্যাপারে সম্যক অবহিত যে, পৃথিবী ছাড়া আরও গ্রহ রয়েছে। এই বিষয়টি জানা গেছে কেবল টেলিস্কোপ আবিষ্কার ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে। অথচ সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা তার প্রিয়নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর এই জ্ঞান অবতীর্ণ করেছেন মানুষ টেলিস্কোপ ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি আবিষ্কারের অনেক পূর্বে।

মুজিজা-১৭

বিংশ শতাব্দীর একটি বিস্ময়কর আবিষ্কার

কুরআন মাজিদ তিন প্রকারের সৃষ্টির কথা বারবার উল্লেখ করেছে : যেসব বিষয় বা বস্তু নভোমণ্ডলে রয়েছে, যেসব বস্তু ভূমণ্ডলে রয়েছে এবং যেসব বস্তু নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের মাঝখানে রয়েছে।

আমি নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল এবং এতদুভয়ের মাঝখানে যা কিছু আছে তা যথার্থভাবেই সৃষ্টি করেছি। (হিজর, ১৫ : ৮৫)

নভোমণ্ডলে, ভূমণ্ডলে, এতদুভয়ের মধ্যবর্তী স্থানে এবং সিক্ত ভূগর্ভে যা আছে তা তাঁরই। (ত্বাহা, ২০ : ০৬)

নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল ও এতদুভয়ের মাঝে যা আছে, তা আমি ক্রীড়াচ্ছলে সৃষ্টি করিনি। (আম্বিয়া, ২১ : ১৬)

কুরআন মাজিদের আরও কিছু আয়াত সেসব বস্তুর নির্দেশ করে যা আল্লাহ তাআলা নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের মাঝখানে সৃষ্টি করেছেন। যেমন : ২৫:৫৯; ৩২:০৪; ৪৩:৮৫; ৪৪:০৭, ৩৮; ৪৬:০৩; ৫০:৩৮; এবং ৭৮:৩৭। মহাকাশ বিজ্ঞান সংক্রান্ত আমাদের সাম্প্রতিক জ্ঞানের ভিত্তিতে আমরা বর্তমানে কুরআন মাজিদে বারংবার উল্লিখিত এসব বিষয়ের ব্যাখ্যার একটি পর্যায়ে রয়েছি। বৈজ্ঞানিকগণ সাম্প্রতিক সময়ে মহাশূন্যে ছায়াপথ বহির্ভূত বস্তুর উপস্থিতি আবিষ্কার করেছে। আমাদের মহাবিশ্বের মৌলিক গঠন প্রক্রিয়ায় সংযুক্তি ও একীভূত হওয়ার পর বিভাজন ও বিক্ষেপণের সংশিষ্টতা− রয়েছে। যেমনটি ইতোপূর্বে বর্ণিত হয়েছে, কুরআন মাজিদ মহাবিশ্বের গঠন প্রক্রিয়ার বর্ণনা দিয়েছে সর্বাধিক উপযুক্ত আরবি শব্দ ‘ফাতাক্ব’ (বিভাজন) ও ‘রাতাক্ব’ (সংযুক্তি)- এর মাধ্যমে। ‘রাতাক্ব’ (সংযুক্তি)- এর প্রাথমিক প্রক্রিয়ার সময় কিছু টুকরো মহাশূন্যের বাইরে থেকে গিয়েছিল। এগুলিকেই বর্তমানে আন্তঃছায়াপথীয় বস্তু বলা হয়। মহাকাশ বিজ্ঞানীরা অতি সম্প্রতিই সেসবের উপস্থিতি সনাক্ত করতে পেরেছে। পক্ষান্তরে কুরআন মাজিদ এসব বিক্ষিপ্ত টুকরার উপস্থিতির স্বীকতিৃ দিয়েছে বহু শতাব্দী পূর্বে।

মুজিজা-১৮

মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ

আমি স্বীয় ক্ষমতাবলে নভোমণ্ডল বিনির্মাণ করেছি এবং নিশ্চয় আমি (নিরন্তর) প্রসারণকারী। (যারিয়াত, ৫১ : ৪৭)

১৯৩৭ সালে রেডিও টেলিস্কোপের (দূরদর্শন যন্ত্রের) উন্নয়নের পরই মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ডাটা-উপাত্ত প্রত্যক্ষ করা গেছে এবং তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই প্রত্যক্ষণের বাইরে মহাকাশ বিজ্ঞানীরা উপস্থাপন করেছেন, যাকে বলে ‘Hubbel Control’ তত্ত্ব। যা সেই পরিমাণ সরবরাহ করে সম্প্রতি মহাবিশ্বের প্রসারণের মাত্রা অনুমানের জন্য যা ব্যবহৃত হয়েছে। এখন বিষয় এই নয় যে, মহাবিশ্ব সম্প্রসারণ হচ্ছে কি-না। বরং বিষয় হল, তা কী মাত্রায় সম্প্রসারিত হচ্ছে? মহাকাশ বিজ্ঞানীগণ এই ব্যাপ্তিকে বিশ বিলিয়ন আলোকবর্ষের একটি নির্দিষ্ট দূরত্বের পরিভাষায় ব্যক্ত করেছেন। রেডিও টেলিস্কোপ সম্প্রতি এই প্রমাণ সরবরাহ করেছে যে, এই মহাশূন্য প্রায় আলোর গতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে। এ ধরনের মহাকাশ বিজ্ঞানসংক্রান্ত সাম্প্রতিক জ্ঞান কিভাবে চৌদ্দশ বছর পূর্বের কুরআন মাজিদে বর্ণিত হতে পারে? তা এ কথাই প্রমাণ করে যে, কুরআন মাজিদ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রেরিত আসমানি গ্রন্থ।

মুজিজা-১৯

সপ্তস্তর বিশিষ্ট আসমান

তিনিই সে সত্তা (আল্লাহ) যিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জন্যে যা কিছু রয়েছে জমিনে, তারপর তিনি মনসংযোগ করেছেন আকাশের প্রতি। বস্তুত তিনি তৈরি করেছেন সাত আসমান। আর তিনি সর্ববিষয়ে অবহিত। (বাকারা, ০২ : ২৯)

আর আমি তোমাদের ওপর সৃষ্টি করেছি সপ্তপথ। (মুমিনূন, ২৩ :১৭)

আর আমি নির্মাণ করেছি তোমাদের ওপর মজবুত সপ্ত আকাশ। (নাবা, ৭৮ : ১২)

এই আয়াতগুলি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রহস্য হয়েই থেকে গেছে। এমনকি এই বিজ্ঞানের যুগের মানুষদের কাছেও। সাম্প্রতিক সময়ে একজন তুর্কি মহাকাশ বিজ্ঞানী ডক্টর হালুক নূর বাকি মহাকাশ বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণার ভিত্তিতে এই আয়াতগুলির ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, যে মহাশূন্য আমাদের পৃথিবীকে বেষ্টন করে আছে তা নিম্নলিখিত সাতটি সমকেন্দ্রিক চৌম্বক স্তরে গঠিত।

১. মহাশূন্যের যে ক্ষেত্র সৌরজগত দ্বারা গঠিত তা প্রথম আসমানের প্রতিনিধিত্ব করে।

২. সম্প্রতি ‘মিল্কিওয়ে’ বা আকাশগঙ্গার চারপাশে একটি চৌম্বক ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। আমাদের ছায়াপথের এই বিস্ততৃ ক্ষেত্রটি দ্বিতীয় আসমানের প্রতিনিধিত্ব করে।

৩. ছায়াপথসমূহের দখড়পধষ ঈষঁংঃবৎদ মহাকাশীয় ক্ষেত্র তৃতীয় আসমানের প্রতিনিধিত্ব করে।

৪. ছায়াপথসমূহের সমন্বয়ে গঠিত মহাবিশ্বের কেন্দ্রীয় চৌম্বক ক্ষেত্র চতুর্থ আসমানের প্রতিনিধিত্ব করে।

৫.  অতি দূর থেকে আগত আলোকতরঙ্গের উৎসসমূহের প্রতিনিধিত্বকারী মহাজাগতিক বলয় পঞ্চম আসমানের প্রতিনিধিত্ব করে।

৬. মহাবিশ্বের প্রসারমান ক্ষেত্র ষষ্ঠ আসমানের প্রতিনিধিত্ব করে।

৭.  মহাবিশ্বের প্রান্তহীন অসীমত্বের নির্দেশক সর্ববহিরস্থ ক্ষেত্র সপ্তম আসমানের প্রতিনিধিত্ব করে।

আসমানের এই স্তরসমূহ অকল্পনীয় স্থান জুড়ে আছে। প্রথম আসমান স্তরের পুড়ত্ব আনুমানিক ৬.৫ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার। দ্বিতীয় স্তর তথা আমাদের ছায়াপথের ব্যাস হল ১৩০ হাজার আলোকবর্ষ। তৃতীয় স্তরের বিস্তার ২ মিলিয়ন আলোকবর্ষ। চতুর্ স্তরের ব্যাস ১০০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ। পঞ্চম স্তরটি ১ বিলিয়ন আলোকবর্ষের দূরত্বে। ষষ্ঠ স্তরটি অবস্থিত ২০ বিলিয়ন আলোকবর্ষের দূরত্বে। একথা বলা বাহুল্য যে, সপ্তম স্তরটি বিস্ততৃ হয়ে আছে অসীম দূরত্ব পর্যন্ত সকল প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা সেই আল্লাহ তাআলার জন্যে যিনি এই সুবৃহৎ ও অসীম মহাবিশ্বের একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা। এই হল সেই সপ্তস্তর আসমান যার ঘোষণা দিয়েছে কুরআন মাজিদ আজ থেকে চৌদ্দশ বছর পূর্বে।

মুজিজা-২০

পৃথিবীর ক্রমবিকাশে চারটি ধাপ

আর তিনি পৃথিবীর উপরিভাগে অটল পর্বতমালা স্থাপন করেছেন এবং তাতে বরকত দান করেছেন এবং চারদিনের মধ্যে তাতে তার খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন, তাদের জন্যে (তথ্যস্বরূপ) যারা জিজ্ঞাসা করে। (ফুসসিলাত, ৪১ : ১০)

বর্তমান বিজ্ঞানীগণ পৃথিবীর ইতিহাসকে নিম্নবর্ণিত প্রধান চারটি ভাগে বিভক্ত করেন-

১.  Pre-Cambrian যুগ : ৬০০ থেকে ৩৩০০ মিলিয়ন বছর। এই যুগে পৃথিবী তার আদি পিণ্ড থেকে বিকশিত হয় এবং একটি স্বতন্ত্র গ্রহের রূপ ধারন করে। জীবনের প্রাচুর্য ও বৈচিত্র্যের মাধ্যমে এ যুগের সমাপ্তি ঘটে।

২.  Paleozoic যুগ : ২৩০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন বছর। এই যুগে সর্বপ্রথম ভূমিজ লতা-পাতা, উভচর প্রাণী ও সরীসৃপ দৃষ্টিগোচর হয়। এটি হল প্রাচীন প্রাণ যুগ।

৩. Mesozoic যুগ : ৬৩ থেকে ২৩০ মিলিয়ন বছর। এটিকে মধ্যপ্রাণ যুগ বলে বিবেচনা করা হয়। মৌসুমী পরিবর্তনের সঙ্গে বৃক্ষ-লতা ভালভাবে খাপ খেয়ে গিয়েছিল। মেরুদণ্ডী প্রাণী, স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং পাখিও এ যুগে গোচরীভূত হয়। আর ডাইনোসর ছিল প্রচুর।

৪.  Conozoic যুগ : বর্তমান সময় থেকে ৬৩ মিলিয়ন বছর। এই যুগ জীবনের বর্তমান ধাপকে অন্তর্ভুক্ত করে।

পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসকে এই চার ভাগে বিভাজন অবিন্যস্ত কিংবা বিশৃঙ্খল নয়, বরং তা করা হয়েছে দৈহিক গঠন প্রক্রিয়ার ক্রম-বিকাশের সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে। এই যুগগুলি বিশ্ব বিস্ততৃ পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে সার্বজনীনভাবে গৃহীত হয়েছে। এগুলি প্রাণীজগৎ ও উদ্ভিদজগতের ক্রমোন্নতি এবং মহাদেশগুলির গতিপ্রবাহ, মহাসাগর ও পর্বতমালার রূপ পরিবর্তনের রেকর্ডেরও প্রতিনিধিত্ব করে। এটিই সম্ভবত সেই চার যুগ যা কুরআন মাজিদ বর্ণনা করে-

‘এবং তিনি (আলাহ) পৃথিবীর  উপরিভাগে অটল পর্বতমালা স্থাপন করেছেন……….তাতে খাদ্যের সংস্থান করেছেন চারদিনের মধ্যে (চারটি সুষম সময়ের মধ্যে)।’

এখানে লক্ষণীয় যে, পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের এই চারটি সময়কাল আকাশ, পৃথিবী ও পুরো মহাবিশ্ব সৃষ্টির ছয় সময়কাল থেকে ভিন্ন। সেগুলি অতীত হয়ে গেছে পাঁচ বিলিয়ন বছরেরও অধিককাল পূর্বে যেখানে মহাবিশ্বের বয়স বর্তমানে ১০ বিলিয়ন বছরেরও অধিক।

মুজিজা-২১

মহাশূন্য বিজয়

‘হে জিন ও মানবকুল, নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের প্রান্ত অতিগম করা যদি তোমাদের সাধ্যে কুলোয় তবে অতিগম কর। তবে (আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে) ক্ষমতা ব্যতিরেকে তোমরা তা অতিগম করতে পারবে না। (রহমান, ৫৫ : ৩৩)

এই আয়াতের প্রকতৃ অনুবাদ বুঝার জন্যে কিছু ব্যাখ্যার প্রয়োজন। বাংলা ভাষায় ‘যদি’ (ইংরেজিতে if ) শব্দটি এমন একটি শর্ত নির্দেশ করে যা, হয়তো সম্ভব কিংবা অসম্ভব —। আরবি ভাষায় ‘যদি’ বুঝানোর জন্যে একাধিক শব্দ ব্যবহৃত হয়। যখন ‘লাও’ শব্দ ব্যবহৃত হয়, তা এমন একটি শর্ত নির্দেশ করে যা অসম্ভব। আর যখন ‘ইন’ (نإ) শব্দ ব্যবহৃত হয়, তা এমন একটি শর্ত নির্দেশ করে, যা সম্ভব। উপরিউক্ত আয়াতে কুরআন মাজিদ (نإ) ‘ইন’ শব্দ ব্যবহার করেছে। ‘লাও’ শব্দ ব্যবহার করে নি। অতএব কুরআন মাজিদ ইঙ্গিত করছে, এক্ষেত্রে সম্ভাব্যতা বিদ্যমান রয়েছে যে, মানুষ একদিন নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের স্তরসমূহ ভেদ করতে পারবে। আরও লক্ষণীয় যে, নিম্ন লিখিত আয়াতেও মহাশূন্য ভেদ করার কথা উল্লেখ করে। কিন্তু তাতে ‘লাও’ ব্যবহৃত হয়েছে-

‘আর যদি আমি ওদের সামনে আকাশের কোনো দরজাও খুলে দিই, আর তারা তাতে দিনভর আরোহনও করতে থাকে, তবুও তারা একথাই বলবে, আমাদের দৃষ্টির বিভ্রাট ঘটানো হয়েছে, না- বরং আমরা যাদুগ্রস্ত হয়ে পড়েছি।’ (হিজর, ১৫ : ১৪-১৫)

এই আয়াতটিতে মক্কার কাফিরদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, এমনকি যদি তারা নভোমণ্ডল ভেদ করতেও সক্ষম হয়, তারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণীকে বিশ্বাস করবে না। এই আয়াতে যে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা হচ্ছে ‘লাও’ (   ) যা এমন সম্ভাবনার কথা বলে, যা বাস্তবায়িত হওয়ার নয়। ইতিহাস দেখিয়েছে, মক্কার কাফিররা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অসংখ্য মুজিজা প্রত্যক্ষ করেছে। তথাপি তারা তিনি যে বার্তা নিয়ে এসেছিলেন তাতে বিশ্বাস স্থাপন করে নি।

ইতোপূর্বে উদ্ধৃত আয়াত সম্পর্কে আরো একটি বিষয় লক্ষ্য করার আছে। তাতে আরবি শব্দ ‘তানফুযু’ (او ) ব্যবহৃত হয়েছে, যার ক্রিয়ামূল হল ‘নাফাজা’ ( ) যার পরে আরবি শব্দ ‘মিন’ () এসেছে। আরবি অভিধান অনুসারে এই বাকরীতির অর্থ হল, ‘সোজা অতিক্রম করা এবং একটি বস্তুর একদিকে প্রবেশ করে অন্যদিক দিয়ে বেরিয়ে আসা। অতএব এটি নির্দেশ করে একটি গভীর অনুগমন এবং একটি বস্তুর অপরপ্রান্ত দিয়ে নির্গমন। এটি হুবহু তা-ই, যে অভিজ্ঞতা বর্তমানে মহাশূন্য বিজয়ের ক্ষেত্রে মানুষ লাভ করেছে। পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তি একটি বস্তু ছেড়ে দেয় এবং তা মহাশূন্যে তার বাহিরে নির্গমন করে। এভাবে কুরআন মাজিদ মহাশূন্য বিজয়ের বিস্ময়কর ঘটনা বর্ণনার ক্ষেত্রে সর্বাধিক উপযুক্ত শব্দ ব্যবহার করেছে। অধিকন্তু এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিকতথ্য, সর্বাধিক উপযুক্ত শব্দে, চৌদ্দশ বছরেরও পূর্বের এমন একজন নিরক্ষর মানুষের নিছক কল্পনা বলে আরোপিত হতে পারে না, যিনি তার পুরো জীবন কাটিয়েছেন একটি মরুময় এলাকায়।

মুজিজা-২২

পৃথিবীর ডিম্বাকার কিংবা বর্তুলাকার আকৃতি

‘অতঃপর তিনি (আল্লাহ) পৃথিবীকে দান করেছেন ডিম্বাকৃতি (নাজিয়াত, ৭৯ : ৩০)

এই আয়াতে যে আরবি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তা হল ‘দাহাহা’ ‘     ‘। পুরনো অনুবাদগুলিতে এই আয়াতের অর্থ রয়েছে- ‘অতঃপর তিনি পৃথিবীকে বিছিয়ে দিয়েছেন।’ যেহেতু তারা পৃথিবীর আকৃতি-প্রকতিৃ সম্পর্কে অবগত ছিলেন না তাই তারা দাহাহা (     ) শব্দটিকে ‘দাহবুন’ (   ) এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছিলেন এবং তার অর্থ করেছিলেন ‘প্রসারিত করা বা বিছিয়ে দেওয়া।’ ‘দাহা’ শব্দের প্রকতৃ অর্থ ‘উটের ডিম’। নিম্নে তার কিছু সাধিত শব্দ দেওয়া হল-

=   আল-উদহিয়্যু (     ) ! উটপাখির ডিম।

=   আল-উদহুয়্যাতু (     ) ! উটপাখির ডিমের স্থান।

=   তাদাহহিয়ান (   ) : গর্তের মধ্যে একটি পাথর পতিত হওয়া।

আয়াতটি এভাবে পৃথিবীর গোলাকতিৃ হওয়ার কথা পরিষ্কারভাবে নির্দেশ করে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর উত্তর-দক্ষিণের ব্যাসের তুলনায় নিরক্ষীয় ব্যাসের আপেক্ষিক পার্থক্য এটিকে একটি বর্তুল আকৃতি কিংবা ডিম্ব আকৃতি দান করেছে। আরও পরিষ্কারভাবে বলতে গেলে, পৃথিবীর প্রকতৃ আকৃতি গঠনে এই আকৃতিটি কিছুটা বিকতৃ হয়েছে, যাকে বলা হয় ‘ Geoid’, যা একটি নাশপাতির অনুরূপ। পৃথিবীর নিরক্ষীয় ব্যাসার্ধ্য হল ৬৩৭৮ কিলোমিটার, যেখানে তার মেরু অঞ্চলীয় ব্যাসার্ধ্য হল ৬৩৫৬ কিলোমিটার।

এই আয়াত থেকে একথাও বুঝা যায়, আদিকালে পৃথিবী এই আকৃতির ছিল না। পরবর্তীতেই এই আকৃতি প্রাপ্ত হয়। মহাকাশ বিজ্ঞানে পৃথিবীর বর্তমান আকার সম্পর্কে দুটি মতবাদ রয়েছে। প্রথম মতানুসারে, পৃথিবী ছিল সূর্য থেকে ছিটকে পড়া একটি টুকরো। দ্বিতীয় মতানুসারে, সূর্য ও পৃথিবী উভয়টিই একটি নীহারিকা থেকে গঠিত হয়েছে। উভয় মতই স্বীকার করে, প্রথম যখন পৃথিবী সৃষ্টি হয় তখন তার বর্তমান আকার ছিল না। পরবর্তী সময়েই এটি ডিম্বাকার লাভ করেছে। এই আয়াতটি উভয় মতের সঙ্গে পরিপূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এই আয়াতের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এটি সুরা ‘আন নাযিয়াত’-এরই একটি অংশ, যাকে ‘ Extractors’ বা উৎপাটনকারীগণ শব্দে ভাষান্তরিত করা যেতে পারে। এই সুরায় সৃষ্টি সম্পর্কিত আরো কিছু রহস্য বর্ণিত হয়েছে। ২৮ থেকে ৩২ নং আয়াত পর্যন্ত আছে পৃথিবী সৃষ্টি সম্পর্কিত সংক্ষিপ্ত তথ্য।

৩১ নং আয়াতে আছে, ‘আর তিনি তা থেকে নির্গত করেছেন পানি ও চারণভূমি।’ অন্য কথায়, এই আয়াত বলে, পৃথিবী তার ডিম্ব আকৃতি লাভ করার পর তাতে পানি প্রদান করা হয়েছিল। ফলে তা পৃথিবীর প্রথম শ্রেণীর উদ্ভিদ যেমন- তণৃ বা ঘাস উৎপন্ন করেছিল। আধুনিককালের ভূতত্ত্ববিদরাও এখন এ কথা বিশ্বাস করেন যে, পৃথিবী বর্তুলাকতিৃ লাভ করার পর বারিমণ্ডল গঠিত হয়। সৃষ্টি হয় সাগর-মহাসাগর। অতঃপর ক্রমান্বয়ে উদ্ভিদরাজি উদ্গত হয়।

৩২ নং আয়াতে আছে, ‘আর পর্বতমালা, তিনি স্থাপন করেছেন সুদৃঢ়ভাবে।’ মহাবিশ্ব সৃষ্টির যে ক্রম পর্যায় কুরআন মাজিদে বর্ণিত হয়েছে ভূবিদ্যাসংক্রান্ত অধুনা ধারণাসমূহ তার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত।

মুজিজা নং– ২৩

বিচার দিবসে পৃথিবীর স্বরূপ

যেদিন পরিবর্তিত করা হবে এই পৃথিবীকে অন্য পৃথিবীতে এবং আসমানসমূহকে (অনুরূপভাবে) এবং লোকেরা একক, পরাগমশালী আল্লাহর সামনে পেশ হবে। (ইবরাহিম, ১৪ : ১৮)

যখন পৃথিবী (-এর আকৃতি) সম্প্রসারিত করা হবে এবং তা নিক্ষেপ করবে তার গর্ভস্থিত সবকিছু আর তা হয়ে যাবে শূন্যগর্ভ। (ইনশিক্বাক, ৮৪ : ০৩-০৪)

প্রথম আয়াতে যে আরবি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তা হল ‘মুদ্দাত’ (   ) যার অর্থ করা যেতে পারে : প্রসারিত, সমতল বা চ্যাপ্টাকৃত কিংবা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে চওড়াকৃত এই আয়াত বলে, বিচার দিবসে পৃথিবী হয়ে যাবে সমতল। অন্য কথায় এই আয়াত থেকে বুঝা যায়, বর্তমানে পৃথিবী সমতল অবস্থায় নেই। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার সময়কাল হতে পারে ৬০৯ থেকে ৬২২ ঈসায়ি সালের মধ্যে। সে সময় একথা সার্বজনীনভাবে বিশ্বাস করা হত যে, পৃথিবী সমতল। প্রায় এক হাজার বছর পর পঞ্চদশ শতাব্দীতে কোপার্নিকাস এই তথ্য নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেন যে, পৃথিবী আমাদের গ্রহজগতের কেন্দ্রবিন্দু নয়। পরবর্তী সময়ে গ্যালিলিও গ্যালিলি কোপার্নিকাসের তথ্যকে সমর্থন করে ঘোষণা দেন যে, পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে পরিভ্রমণ করে এবং তা সমতল নয়; বরং গোলাকার। কুরআন মাজিদে এই বাস্তবতা অবতীর্ণ হয়েছে বহু শতাব্দী পূর্বে। পৃথিবী তার গোলাকতিরৃ কারণে, কখনো তার সমগ্র অংশে একই সময়ে দিন হয় না। তার যে অংশ সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে তাতে দিন হয় এবং তার বিপরীত অংশে হয় রাত। পক্ষান্তরে, বিচার দিবসে একই সময়ে সারা পৃথিবীতে দিন থাকবে। এটি তখনই সম্ভব যখন পৃথিবীর আকৃতি গোলাকার থেকে সমতলে পরিবর্তিত হবে। এটা হুবহু তা-ই যা উপরে উদ্ধৃত দ্বিতীয় আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে। যদি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে কুরআন রচনা করে থাকেন, তবে তিনি কিভাবে এ ধরনের জটিল প্রাকৃতিক রহস্য উদ্ঘাটনে সক্ষম হলেন?

মুজিজা নং– ২৪

ভূমির সংকোচন

তারা কি দেখে না যে, আমি ভূভাগকে তার প্রান্তসীমা থেকে গমাšয়ে সংকোচিত করে আসছি? আল্লাহ নির্দেশ দেন। তার নির্দেশকে পশ্চাতে নিক্ষেপকারী কেউ নেই। তিনি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। (রা’দ, ১৩ : ৪১)

যেমনটি ইতোপূর্বে বর্ণিত হয়েছে, পূর্ব যুগের মুসলমানরা এই আয়াতটিকে কুরআন মাজিদের একটি রহস্য হিসেবে গ্রহণ করেছিল। যতদিন তাদের যথাযথ জ্ঞান ছিল না, তারা এই আয়াতের সুনির্দিষ্ট অর্থ প্রদান করতে চেষ্টা করে নি। অধুনা বৈজ্ঞানিক জ্ঞান আজ আমাদেরকে এই আয়াতের অর্থ অনুধাবন করতে ও ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম করেছে।

এটি একটি জ্ঞাত বিষয় যে, মেরু অঞ্চলে জমাট বরফের স্তুপগুলি গলতে শুরু করেছে এবং সাগরের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তা পর্যায়ক্রমে আরও ভূভাগকে ঢেকে ফেলছে। আয়াতে উল্লিখিত প্রান্তসীমা হল সমুদ্র উপকুলসমূহ। মেরু অঞ্চলের গলিত বরফের ফলে যতই সমুদ্রের উপকুল পানির নিচে তলিয়ে যাবে, ততই ভূভাগ বা পৃথিবী সংকোচিত হয়ে পড়বে। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাথীরা চৌদ্দশ বছর পূর্বে আরব উপদ্বীপের মত একটি মরুভূমিতে বসে এই বিস্ময়কর তথ্য নিশ্চয় কল্পনা করতে সক্ষম ছিলেন না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here